।। ড. মো. আবু হাসান ।।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতির ইতিহাস আসলে ক্ষমতার পালাবদলের সরল কাহিনি নয়; এটি একটি পুনরুৎপাদিত ট্র্যাজেডি, যা বারবার ফিরে এসেছে অলিগার্কির সপ্তভূজ লৌহ কাঠামো, মানবপুঁজির কাঠামোগত অপচয় এবং স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্যের রূপ ধরে। এই ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন বেগম খালেদা জিয়া; ব্যক্তিগত শোক ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে ক্ষতবিক্ষত একজন নিঃসঙ্গ মানুষ, কিন্তু একইসঙ্গে সার্বভৌমত্বের আপসহীন প্রতীক ও ভঙ্গুর গণতন্ত্রের শেষ কার্যকর নৈতিক মেরুদণ্ড।
ব্যর্থ রাষ্ট্র ও বিশ্বাসঘাতক রাজনীতির ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাকে এক ধরনের ‘নিঃসঙ্গ ফিনিক্সে’ পরিণত করেছে; তার লড়াই এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলেও তিনি এক অসমাপ্ত মুক্তির স্পষ্ট প্রতীক। এই ট্র্যাজেডির কাঠামো দ্বিমুখী। একদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের রোমান্টিক আদর্শবাদ থেকে বাকশাল হয়ে শেখ হাসিনার পরিণত কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিস্ট শাসনপ্রবণতা; অন্যদিকে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ইনক্লুসিভ রাষ্ট্রগঠনের প্রচেষ্টা, যা শেষ পর্যন্ত নিষ্কাশনমূলক প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁদের ভেতরে আটকে গেছে (এসেমগলু ও রবিনসন, ২০১২)। এই নিবন্ধ সেই ফাঁদের ভেতরে জিয়া–খালেদা অধ্যায়ের অবস্থান, বিশেষ করে বেগম জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বকে, বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অর্থনীতির সংকটের সঙ্গে তাত্ত্বিকভাবে যুক্ত করে পড়তে চায়।
১. তাত্ত্বিক কাঠামো ও নিঃসঙ্গ ফিনিক্স
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সর্বব্যাপী সম্পদ নিষ্কাশন ও মানব পুঁজি অপচয়ের যে ধারা সূচিত হয়েছিল, তা পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও নানা অবয়বে টিকে আছে। প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে, স্বাধীনতার পর আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার বদলে গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে; ফলে ক্ষমতা ও সম্পদ ক্রমশ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় অলিগার্কির সনাতন ‘লৌহ ত্রিভূজ’ কাঠামোটি সম্প্রসারিত হয়ে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক ‘সপ্তভূজ লৌহ কাঠামো’তে রূপ নিয়েছে (মিশেলস, ১৯১১; হাসান, ২০২৫)। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল জনপ্রিয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা, যার ফলে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে গেঁথে গেছে এক গভীর ‘স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য’।
অলিগার্কির সপ্তভূজ লৌহ কাঠামোর সাতটি হাত হলো: (১) রাজনৈতিক ক্ষমতা, (২) আমলাতন্ত্র, (৩) লুটেরা ব্যবসায়ী, (৪) প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ, (৫) মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক চক্র, (৬) বিদেশি মিত্র, এবং (৭) ধর্মীয় ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক প্রভাবক। এরা একে অপরের সহযোগী হয়ে (মিথোজীবী সম্পর্কে) পুরো রাষ্ট্র দখল করে রাখে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও ন্যায্য পাওনাকে পরিকল্পিতভাবে সংকুচিত করে ফেলে। এদের মূল কৌশল শুধু অর্থ লুট করা নয়, বরং নাগরিকদের ‘সময়’ ও ‘জ্ঞানগত সক্ষমতা’ হাইজ্যাক করা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্বজনপ্রীতি, দীর্ঘসূত্রিতা, হামলা-মামলা, অপর্যাপ্ত ও মিথ্যা তথ্য আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে মানুষকে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা হয় যে, তারা নিজেদের সময়ের মূল্য বা অধিকার নিয়ে চিন্তা করার শক্তিই হারিয়ে ফেলে। ফলে মানুষরা সৃষ্টিশীল কাজ না করে কেবল সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বা টিকে থাকতে গিয়েই ফুরিয়ে যায়। আমাদের মানবসম্পদ আছে, কিন্তু এই কাঠামোর কারণে তা আজ সুপ্ত, বিকৃত বা অকার্যকর; যাকে আমি ‘মানব পুঁজির কাঠামোগত অপচয়’ বলছি।
এর চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক ফল হলো স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য। মানুষ অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিখে ফেলে যে, যতই আশার আলো দেখা যাক, দিনশেষে দমন-পীড়ন আর লুটপাটই ফিরে আসবে। ‘লার্নেড হেল্পলেসনেস’ বা অর্জিত অসহায়ত্বের মতো জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ‘আসলে কিছুই বদলাবে না’ (সেলিগম্যান, ১৯৭২)। এই গণ-হতাশাই অলিগার্কির সবচেয়ে বড় পুঁজি। এভাবেই চক্রটি চলতে থাকে; প্রথমে তারা মানুষের সময় ও চেতনা দখল করে মানুষকে অকেজো করে, আর তারপর মানুষের সেই অসহায়ত্ব ও নৈরাশ্যকে পুঁজি করে নিজেদের শাসনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
সর্বগ্রাসী সপ্তভূজ লৌহ কাঠামো যখন নাগরিকদের মনে স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য গেঁথে দিয়ে এই বিশ্বাস জন্মাতে চায় যে ‘কিছুই বদলাবে না’, ঠিক সেখানেই বেগম খালেদা জিয়া এক বিস্ময়কর তাত্ত্বিক ব্যতিক্রম। অলিগার্কি চেয়েছিল তাকে ‘ম্যানেজ’ করতে অথবা রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে ভেঙে ফেলতে; কিন্তু তিনি ‘অর্জিত অসহায়ত্বে’ আত্মসমর্পণ করেননি। বরং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও শারীরিক ভঙ্গুরতাকে উপেক্ষা করে একাই এই নিষ্কাশনমূলক স্রোতের বিপরীতে ‘আপোসহীন’ অবস্থান নিয়েছেন। তিনি একই কাঠামোর ভেতরে থেকেও অন্তত তিনটি জায়গায় অলিগার্কিক পক্ষাঘাতের চক্রাকার প্রবাহকে আঘাত করেছেন: (১) অ্যান্টি-ক্লায়েন্টেলিজম: তিনি সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে অলিগার্কিক সমঝোতার বাইরে সুস্পষ্ট রেডলাইন টেনেছেন। ভারতীয় প্রভাব, সামরিক শাসন, ওয়ান–ইলেভেন বা একতরফা নির্বাচনের সঙ্গে আপস না করে তিনি অলিগার্কির রাজনৈতিক বাহুকে স্থায়ী ক্লায়েন্টেলিজম বা মক্কেলতন্ত্রে পর্যবসিত হতে দেননি। (২) নৈরাশ্যের পাল্টা বয়ান: নিজের সুবিধা, সন্তান ও নাতনীদের সান্নিধ্য, নিরাপত্তা ঝুঁকি, এবং ভয়ানক অসুস্থতা সত্ত্বেও দেশ না ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ‘লার্নেড হেল্পলেসনেস’-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী ‘প্রতীকী প্রতিরোধ’ গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা গেছে যে- সবাই সমান নয়; অন্তত একজন নেতা কাঠামোর বিরুদ্ধে থেকেও ভেঙে পড়েননি। (৩) নৈতিক পুঁজির সংরক্ষণ: বডি-পলিটিক্স ও স্লাট–শেইমিংয়ের মুখেও তিনি ‘রিপাবলিকান ডিসেন্সি’ ও রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখেছেন। এতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, অলিগার্কির মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক বাহু যতই চরিত্রহননের চেষ্টা করুক, একজন নেতার ‘নৈতিক পুঁজি’ পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
এই তিন কারণে তিনি লৌহ কাঠামোর ভেতরে থেকেও পূর্ণাঙ্গ বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে না পারলেও, নিষ্কাশনমূলক ফাঁদের ওপর এক নিরন্তর ‘নৈতিক চাপ’ সৃষ্টি করে গেছেন। এই সংগ্রামই তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির ইতিহাসে এক ‘নিঃসঙ্গ ফিনিক্স’-এ পরিণত করেছে; যিনি দেখিয়েছেন, কাঠামোগত নিরাশার মাঝেও নৈতিক প্রতিরোধ সম্ভব এবং অর্থবহ।
২. জিয়া: ইনক্লুসিভ প্রজেক্ট ও প্যারাডাইম শিফট
বাংলাদেশের দীর্ঘ নিষ্কাশনমূলক রাজনৈতিক ধারায় জিয়াউর রহমানের শাসনকাল ছিল এক বিরল ব্যতিক্রম এবং প্রকৃত ‘প্যারাডাইম শিফট’। রসায়নবিদ পিতা ও সংগীতানুরাগী মায়ের সন্তান এই সমরনায়ক ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে ‘হিলাল-ই-জুরাত’ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘বীর উত্তম’ খেতাব অর্জন করেন; কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি আসীন হন ‘জাতীয় বীর’-এর মর্যাদায়। পরবর্তীতে ১৯৭৫-এর চরম অস্থিরতায় ঐতিহাসিক ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি’র মাধ্যমে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। সামরিক পটভূমি সত্ত্বেও, বিশ্ব ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে বিরল ব্যতিক্রম হয়ে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সমন্বিত করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তি গড়ে তোলেন।
অর্থনীতিতে তিনি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি বিপ্লব, জনশক্তি রপ্তানি ও গার্মেন্টস খাতের সূচনার মাধ্যমে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মানবপুঁজি উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে তিনি যে মেধাতান্ত্রিক, স্বজনপ্রীতিমুক্ত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রাষ্ট্রপরিচালনার মডেল গড়তে চেয়েছিলেন, তা পরবর্তীকালের অগ্রগতির ‘বীজতলা’ হয়ে দাঁড়ায়। অলিগার্কিক স্বার্থগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডে এই ইনক্লুসিভ প্রকল্প অসমাপ্ত থেকে গেলেও, তাঁর রেখে যাওয়া সততা ও উন্নয়ন-দর্শনই পরবর্তীকালে বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির রাজনীতির মূল নৈতিক ভিত্তি রচনা করে।
৩. গৃহবধূ থেকে ইস্পাতদৃঢ় নেত্রী
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান কোনো সাধারণ ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং এটি গভীর ব্যক্তিগত ট্রমা থেকে একজন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সাবজেক্টে রূপান্তরিত হওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিশোরী বয়সে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে শীর্ষস্থান অধিকারী পেশাদার সামরিক অফিসার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সামরিক ক্যারিয়ার ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনের ব্যস্ততায় তাকে একা হাতে সংসার ও সন্তান লালন-পালনের গুরুদায়িত্ব নিতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দুই নবজাতক সন্তানকে নিয়ে শত্রুবেষ্টিত অবস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নয় মাস বন্দি থাকা ছিল তাঁর জীবনের এক চরম অধ্যায়। এ সময় লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ, মানসিক নির্যাতন এবং স্বামীর সম্ভাব্য মৃত্যুর আশঙ্কা; সব মিলিয়ে তিনি এক স্থায়ী ট্রমা বহন করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতার বয়ান তিনি পরবর্তী জীবনে প্রায় কখনোই জনসমক্ষে উচ্চারণ করেননি। তাঁর এই ‘ইচ্ছাকৃত নীরবতা’ই এক ধরনের ‘নীরব প্রতিরোধ’, যা তাকে এক ট্র্যাজিক কিন্তু ইস্পাতদৃঢ় রাজনৈতিক সত্তায় রূপান্তরের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি জুগিয়েছে। এই নীরব সংগ্রামের ইতিহাসই পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের নৈতিক কঠোরতার মূল উৎস হয়ে ওঠে।
৪. শোক, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ক্যারিশমাটিক অথরিটি
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর কফিন আঁকড়ে ধরা সাদা শাড়ি পরিহিত এক তরুণী বিধবার নিঃশব্দ কান্না কেবল ব্যক্তিগত শোক ছিল না; তা পরিণত হয় জাতীয় ট্র্যাজেডির এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্দিত্ব থেকে ১৯৭৫-এর ক্যু-পাল্টা ক্যু; এই দীর্ঘ ও পুঞ্জীভূত ট্রমা শেষ পর্যন্ত স্বামীর নির্মম হত্যাকাণ্ডে রূপ নিলে, তা অসমাপ্ত রাষ্ট্রগঠন প্রকল্পের ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে জনগণের মনে গেঁথে যায়।
জিয়ার মৃত্যুর পরপরই যখন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা সামান্য ক্ষমতার লোভে সামরিক শাসক এরশাদের সঙ্গে আপস করে, তখন বাংলাদেশের এলিট রাজনীতির ‘ক্লায়েন্টেলিস্ট’ বা তোষণমুখী চরিত্র নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়। একই সমান্তরালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামীও বিভিন্ন পর্যায়ে এরশাদ সরকারের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতায় লিপ্ত হয়ে স্বৈরশাসনকে দীর্ঘায়িত হতে সহায়তা করে। নিজ দলের বিশ্বাসঘাতকতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর এই সুবিধাবাদী স্রোতের বিপরীতে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ অবস্থান তাকে এক অনন্য নৈতিক উচ্চতায় আসীন করে। তিনি সমঝোতার সব ‘শর্টকাট’ প্রত্যাখ্যান করে গণআন্দোলনের চাপ এমনভাবে অক্ষুণ্ণ রাখেন যে, স্বৈরশাসনের আয়ুষ্কাল কমে আসতে বাধ্য হয়। চতুর্পাশের এই আপসের মুখে তার ইস্পাতদৃঢ় অবস্থান ম্যাক্স ওয়েবারের (১৯২২) ‘ক্যারিশমাটিক অথরিটি’র ধ্রুপদী উদাহরণ; যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে নেত্রীর ব্যক্তিগত সততা, শোক-সহনশীলতা ও নৈতিক দৃঢ়তাই জনগণের আস্থার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই আস্থার প্রতিফলন দেখা যায় তার রাষ্ট্র পরিচালনায় ও সংকট মোকাবিলার দক্ষতায়। ১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েই সুপার সাইক্লোনের মতো মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় তিনি দ্রুত অপারেশন সি এঞ্জেলের মাধ্যমে কার্যকর পুনর্বাসন পরিচালনা করেন। তার আমলে জেএমবি–ধরনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সামরিক ও আইনি উভয় ফ্রন্টে প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিউট্রালাইজ হয়। পরবর্তীতে ২০০৭–এর ওয়ান–ইলেভেন সামরিক–সমর্থিত সরকারের তীব্র চাপ সত্ত্বেও তিনি দেশত্যাগ করেননি; যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বিঘ্নে বিদেশে অবস্থান নিয়েছেন, সেখানে তিনি ও তাঁর দল দেশেই থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন।
৫. ডিসেন্সি, সিভিক সেন্স এবং নৈতিক হেজিমনি
বাংলাদেশের কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বেগম খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির শীর্ষ নেত্রী নন, বরং রাজনৈতিক শালীনতার এক বিরল প্রতীক। জিয়াউর রহমানের সততা ও মিতব্যয়িতার যে ব্র্যান্ড ইমেজ দলটির প্রাথমিক পুঁজি ছিল, তিনি সেই লিগ্যাসি ধারণ করে রাজনীতিকে সংঘাতের বদলে সংযমের পথে নিতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত অপমান ও রাষ্ট্র-সমর্থিত চরিত্রহননের মুখেও তিনি কখনো প্রতিপক্ষকে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করেননি; এই সংযত ‘ডিসেন্ট পলিটিক্স’ ছিল তাঁর প্রধান নৈতিক বর্ম। একইসাথে তিনি পরিবারিক শোককে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপ না দিয়ে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ রেখেছেন; যা বাংলাদেশে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হাসিনার শোক–কেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে এক স্পষ্ট ‘রিপাবলিকান ডিপারচার’।
একজন গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যাত্রায় তিনি নিজের প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সীমাবদ্ধতা অকপটে স্বীকার করে অভিজ্ঞদের সহায়তা চেয়েছেন; যা দুর্বলতা নয়, বরং রাষ্ট্রনায়কোচিত বিনয়ের লক্ষণ। আহমদ ছফা-সম্পর্কিত ঘটনাগুলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একদিকে, বুদ্ধিজীবী ছফা শর্ত দেন যে প্রধানমন্ত্রীকে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতে হবে এবং ফোনে পরিচয় জানতে চাওয়ায় পিএস-কে গালমন্দ করেন; অন্যদিকে, খালেদা জিয়া ব্যক্তিগত অপমান সয়েও বিনয়ের সঙ্গে কলব্যাক করেন এবং নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্ককে পেশাদার রাখতে চান। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের শহুরে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এই অপেশাদার কোর্ট–কালচার আচরণকেই ‘সাহস’ বলে উদযাপন করেছে এবং রান্না-ভিত্তিক আতিথেয়তাকে নেতৃত্বের গুণ হিসেবে প্রচার করে প্রকারান্তরে ব্যক্তিপূজাকেই শক্তিশালী করেছে।
তবে দলের ভেতরে একটি গভীর ‘ইন্টারনাল প্যারাডক্স’ বিদ্যমান। খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে যে উচ্চ নৈতিক মান ও রিপাবলিকান সিভিক সেন্সের চর্চা করেছেন, তাঁর দলের সাংগঠনিক সংস্কৃতি সবসময় তার সমকক্ষ হতে পারেনি। সুবিধাবাদী অংশের কারণে নেত্রীর নৈতিক অবস্থান অনেক সময় মাঠপর্যায়ে প্রতিফলিত হয়নি। তবুও, দুর্নীতিমুক্ত থাকার সাহস এবং চরম উসকানিতেও শালীনতা বজায় রাখার সক্ষমতা তাঁকে এমন এক ‘নৈতিক হেজিমনি’ বা আধিপত্যে আসীন করেছে, যা অলিগার্কি নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রহনন সত্ত্বেও অটুট রয়েছে।
৬. জেন্ডার্ড ভায়োলেন্স ও বডি পলিটিক্স
বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা দক্ষিণ এশীয় নারীনেতৃত্বের ইতিহাসে এক চরম ট্র্যাজিক অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় পিতৃতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মিলে তাঁর রাজনৈতিক বৈধতা খর্ব করতে এক অশ্লীল জোট গঠন করেছিল। তথাকথিত প্রগতিশীল মহল থেকে সংসদ পর্যন্ত তাঁকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ‘স্লাট-শেইমিং’ চালানো হয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের পর জিয়া তাঁকে ঘরে তুলতে চাননি’ কিংবা ‘অন্য কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল’; এমন জঘন্য গুজব খোদ রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে ছড়ানো হয়েছে। এমনকি তাঁর জীবন-সংশয়ী অসুস্থতা নিয়েও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা প্রকাশ্যে যে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য (‘কি খেলে লিভার পচে…’) করেছিলেন, তা প্রমাণ করে রাষ্ট্রযন্ত্র একজন নারীনেত্রীকে অমানবিকীকরণের কতটা নিচে নামতে পারে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, শাসকদল-ঘনিষ্ঠ নারী ও নারীবাদী মহলের অধিকাংশই এ বিষয়ে নীরব থেকেছেন; যা প্রমাণ করে যে তাদের কাছে সার্বজনীন জেন্ডার ন্যায়বিচারের চেয়ে দলীয় আনুগত্যই প্রধান। চরিত্রহননের এই দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর শাসকের ক্রোধ বডি পলিটিক্সে রূপ নেয়। উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চনা, দীর্ঘ কারাবাস ও আইনি টানাপোড়েনের মাধ্যমে তাঁর অসুস্থ শরীরকে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার করা হয়েছে। তবুও তিনি নিরাপদ নির্বাসন বা দেশত্যাগ না করে এই নাজুক শরীর নিয়েই দেশে থাকার যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নারীর শরীরকে অপমানের মাধ্যম বানানোর রাজনীতিকে অকার্যকর করে দিয়েছে। ফলত, তিনি বর্তমানে ‘শারীরিকভাবে নাজুক কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয়’ এক অবিসংবাদিত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
৭. কৌশলগত সীমাবদ্ধতা ও অলিগার্কিক ফাঁদ
বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন সংগ্রামের ইতিহাস উজ্জ্বল হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কিছু কৌশলগত সীমাবদ্ধতা ও ভুল সিদ্ধান্ত অলিগার্কিক কাঠামোকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করেছে। ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচন ছিল এমন এক ক্রিটিক্যাল জাংচার, যা নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে। এই সুযোগে অলিগার্কি-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা বিএনপিকে ‘আওয়ামী লীগের প্রতিবিম্ব’ হিসেবে ফ্রেম করার সুযোগ পায়, যা দলের নৈতিক স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষুণ্ণ করে। ২০০১-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে জোটে রাখা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার অন টেরর’ ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের সমীকরণ মেলাতে ব্যর্থ হওয়া ছিল বড় কৌশলগত বিচ্যুতি। এতে বিএনপির আন্তর্জাতিক ‘নর্মেটিভ সাপোর্ট’ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অলিগার্কির ধর্মভিত্তিক বাহুটি রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত হওয়ার সুযোগ পায়।
একই সঙ্গে, দলের অভ্যন্তরে বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও মান্নান ভূঁইয়ার মতো উদার ও ‘ব্রিজ-বিল্ডিং’ সক্ষম নেতাদের সরিয়ে দেওয়ায় অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র কেলেঙ্কারি এবং বিচারপতির বয়স বাড়ানোর মতো ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক ও নৈতিক ম্যানেজমেন্টে ব্যর্থতা আইনি ক্ষেত্রে ‘রুল অফ ল’-এর বদলে অলিগার্কি ধারার ‘রুল বাই ল’-কেই শক্তিশালী করেছে।
অবশ্য এই সীমাবদ্ধতাগুলো বিচার করার সময় ‘জনতার মঞ্চ’-এর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক বিদ্রোহ, নব্বইয়ের দশকে জামায়াত-আওয়ামী জোটের ধ্বংসাত্মক হরতাল এবং অলিগার্কির সম্মিলিত চক্রান্তকে উপেক্ষা করা যায় না। এই বহুমুখী চাপের মুখে বিএনপি নেতৃত্ব বারবার আংশিক আপোস ও সমঝোতার পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। এর সামগ্রিক ফলাফল হলো; ইনক্লুসিভ প্রজেক্ট পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি, আর অলিগার্কি ‘সবাই সমান’ ন্যারেটিভ প্রচার করে জনগণের মনে স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্য আরও গাঢ় করার বৈধতা পেয়েছে।
৮. ছফা–নর্মালাইজেশন ও শহুরে এলিট
বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত ও এলিট সমাজে আহমদ ছফা-ধারার বুদ্ধিজীবীরা যে রাজনৈতিক রুচি তৈরি করেছেন, তা মূলত অলিগার্কিক কাঠামোর মিডিয়া-ইন্টেলেকচুয়াল বাহুর একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তিভূমি হিসেবে কাজ করেছে। রান্না, ব্যক্তিগত দাওয়াত এবং দরবারি গল্পকে মহত্ত্ব হিসেবে প্রচার করে তারা নেতৃত্বের মানদণ্ডকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবনমন ঘটিয়েছেন। ফলে জনগণ রাজনৈতিক নেতাকে একজন পলিসি-অ্যাক্টর হিসেবে বিচার না করে, ব্যক্তিগত আতিথেয়তা ও আবেগের নিরিখে মূল্যায়ন করতে শিখেছে।
এই ‘নর্ম সেটিং’ প্রক্রিয়াটি দুটি উপায়ে স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্যকে পুষ্ট করেছে। প্রথমত, এটি রাজনীতিকে লঘুকরণ করেছে। নীতিগত ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহির বদলে জনমানস আটকে গেছে ‘কে কাকে রান্না করে খাওয়াল’-এমন সংস্কৃতিবিষয়ক তুচ্ছতায়; যা কাঠামোগত লুটপাটকে আড়াল করতে সহায়তা করে। দ্বিতীয়ত, এটি নেতৃত্বের মূল্যায়নে এক ভ্রান্ত বাইনারি তৈরি করেছে। বেগম খালেদা জিয়ার মতো পেশাদার রিপাবলিকান নেতাকে ‘অহংকারী’ বা ‘অমায়িক নন’ হিসেবে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করা হয়েছে; আর এর বিপরীতে প্রবল ব্যক্তিপূজার কেন্দ্রে থাকা হাসিনাকে ‘গৃহিণীসুলভ উষ্ণ’ হিসেবে গ্লোরিফাই করা হয়েছে। এই মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিং রাষ্ট্রের প্রতি রিপাবলিকান জবাবদিহির চেয়ে সামন্তপ্রভুর মতো ব্যক্তিগত আনুগত্যকেই শক্তিশালী করেছে, যা নৈরাশ্যকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম জ্বালানি।
৯. ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক প্রতীকী রূপ
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের ট্র্যাজেডি মূলত দ্বিমুখী: একটি দিক কাঠামোগত, অন্যটি একান্তই ব্যক্তিগত। রাষ্ট্রীয় অলিগার্কি আইনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। ব্যাংক লুট ও হাজার কোটি টাকা পাচারের মহোৎসবের বিপরীতে তাঁর বিরুদ্ধে নগণ্য অর্থের কথিত অনিয়মের মামলা ছিল স্পষ্টত ‘সিলেক্টিভ জাস্টিস’। এর লক্ষ্য দুর্নীতি দমন ছিল না; বরং বিরোধী নেতৃত্বকে কলঙ্কিত করে ‘সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত’; এমন ধারণা ছড়িয়ে ক্ষমতাসীনদের লুণ্ঠন বৈধ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
এই কাঠামোগত নিপীড়নের সমান্তরালে চলেছে ব্যক্তিগত নিঃস্বকরণ। স্বামী, সন্তান, মা-ভাই, স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন থেকে নাতনিদের সান্নিধ্য; সব হারিয়েছেন তিনি। কারাগারের স্যাঁতসেঁতে কক্ষ, জরাজীর্ণ শরীর আর তিনটি কম্বলের নিঃসঙ্গতা তাঁকে আজ জাতির সামনে এক ‘মাদার ফিগার’-এ পরিণত করেছে; যার নিজের আর পাওয়ার কিছু নেই, কিন্ত জাতির কাছে নৈতিক পাওনা অনেক। তবু ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন তাঁর জীবদ্দশায় এক বিরল ঐতিহাসিক প্রাপ্তি। এই চরম ক্ষমতার পালাবদলেও তিনি প্রতিহিংসাহীন ও শালীন রাজনীতির যে নজির রেখেছেন, তা তাঁকে এক ‘নিঃসঙ্গ ফিনিক্স’-এ পরিণত করেছে; যিনি বারবার ছাই থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন, যদিও নিজের সময়ের কাঠামোগত ট্র্যাজেডিকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারেননি।
১০. উত্তরাধিকারের সংকট ও হাইপার-কাস্টোডিয়ানশিপ
বর্তমানে খালেদা জিয়ার এই ত্যাগের লিগ্যাসি হাইজ্যাক করতে কতিপয় তাত্ত্বিক, রাজনীতিবিদ, ইউটিউবার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট স্ট্র্যাটেজিক ডিকাপলিংয়ের মাধ্যমে হাইপার-কাস্টোডিয়ানশিপের ধূর্ত কৌশল অবলম্বন করছেন। তারা জিয়া-খালেদার আদর্শকে বিএনপি ও তারেক রহমান থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের প্রকৃত অভিভাবক দাবি করছেন, যা মূলত সপ্তভুজ কাঠামোর মিডিয়া ও ধর্মীয় বাহুর এক হাইব্রিড প্রজেক্ট। পাকিস্তান আমল থেকে জামায়াতপন্থীদের ডিপ-স্টেট নির্ভরতা এবং পরবর্তীতে আওয়ামী-ঘনিষ্ঠদের মুক্তিযুদ্ধ-বাণিজ্য; উভয়ই শেষ পর্যন্ত ব্যুমেরাং হয়েছিল। পাশাপাশি ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ নব্য বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও সেই সুবিধাবাদী ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও আজ দৃশ্যমান।
১১. অসমাপ্ত মুক্তি ও নৈতিক রিজার্ভ
আজ যখন বেগম খালেদা জিয়া জীবন-সংকটাপন্ন, তখন দলমত নির্বিশেষে লাখো মানুষের দোয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শ্রদ্ধা প্রমাণ করে যে, একজন রাজনীতিকের জীবদ্দশায় এ মাত্রার সম্মান ইতিহাসে বিরল। এই গণ-অনুভূতি তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এটি নির্দেশ করে যে, স্থিতিশীল উন্নয়নগত নৈরাশ্যের ঘন অন্ধকারের মধ্যেও সমাজের গভীরে এক ধরনের ‘মোরাল রিজার্ভ’ এখনো বেঁচে আছে।
খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও রাজনীতিতে তার উপস্থিতি আজ আর কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের বৃহত্তর রিপাবলিকান স্বার্থের জন্যই জরুরি। তিনি এখন ক্ষমতার প্রচলিত সমীকরণে কেবল বিকল্প নন, বরং রাষ্ট্রের জন্য এক অপরিহার্য নৈতিক রেফারেন্স পয়েন্ট। ব্যক্তিগত শোক, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও শারীরিক ভঙ্গুরতার মাঝেও তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আপোসহীন গণতান্ত্রিক অবস্থান ধরে রাখা যায় এবং বিরোধীকে রাজনৈতিক শত্রু ভাবলেও কখনো ‘শত্রু-মানব’ হিসেবে গণ্য না করে মানবিক মর্যাদা দেওয়া যায়। এমনকি তার চরম শত্রুরাও কখনো তাঁর নামের আগে ‘স্বৈরাচার’ শব্দটি যুক্ত করতে পারেনি; যা তাঁর গণতান্ত্রিক নিষ্ঠার এক অবিসংবাদিত দলিল।
তাঁর এই মহাকাব্যিক জীবনগাথা; কিশোরী গৃহবধূ থেকে ইস্পাতদৃঢ় বিধবা, স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আইকন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং আজকের নিঃসঙ্গ বার্ধক্য; সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির ট্র্যাজেডিরই এক ঘনীভূত ইতিহাস। এই ইতিহাস এখনো অসমাপ্ত। যদি আমরা অলিগার্কিক পক্ষাঘাতের এই নিষ্কাশনমূলক ফাঁদ ভাঙতে চাই, তবে জিয়া–খালেদা লিগ্যাসির সেই ইনক্লুসিভ ও ডিসেন্ট পলিটিক্সকে কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যারিশমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে একটি টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে হবে। সেই অসমাপ্ত মুক্তির পথে, নিঃসঙ্গ হলেও উজ্জ্বল এক ‘ফিনিক্স’ হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রতীক হয়ে থাকবেন।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা, অর্থনীতির শিক্ষক ও গবেষক
Email: hhafij@yahoo.com






Add Comment